রবিবার, ১২ই জুলাই, ২০২০ ইং, সন্ধ্যা ৬:৩৪

দক্ষিনের ৩ জেলার ৫৫ গ্রাম জুড়েগড়ে উঠেছে ভীমরুলী ভাসমান পেয়ারার হাট

আজমীর হোসেন তালুকদার, ঝালকাঠি: দক্ষিনের ৩জেলার সংযোগস্থল ঝালকাঠির সদর উপজেলা- পিরোজপুরের স্বরুপকাঠি ও বরিশালের বানারিপাড়া সীমান্তের ৫৫টি গ্রাম নিয়ে গড়ে উঠেছে বাংলার আপেল খ্যাত ‘পেয়ারা সাম্রাজ্য’। প্রতিবছর আষাঢ়, শ্রাবণ ও ভাদ্র মাস এলেই পেয়ারার কারণে পাল্টে যায় তিন উপজেলার মিলন মোহনার ওই অঞ্চলের চিত্র। পেয়ারা বেচা-বিক্রির জন্য রয়েছে ভাসমান পেয়ারা হাট।

প্রতিদিন শত শত নৌকায় চাষীরা বাগান থেকে আসেন পেয়ারা বিক্রি করতে। স্থলের হাট-বাজার গুলোতে ছোট-বড় ট্রাক ও বড় ট্রলার নিয়ে শত শত পাইকাররা আসেন পেয়ারা কিনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিয়ে যেতে।

অণ্যদিকে এর সাথে মৌসুমের অপূর্ব এই প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন ভ্রমণ পিপাসুরা। শুধু দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেই নয়, প্রবাসী ও বিদেশী অতিথিরাও আসেন উপভোগ করতে। সরকারী পৃষ্ঠ পোষকতায় অভাব ও নির্ধারিত কোন পর্যটন কেন্দ্র না থাকায় ভ্রমন পিপাসুরা পেয়ারা বাগানে নির্বিঘে প্রবেশ করে পেয়ারা নষ্ট ও ডালপালা ভেঙে তছনছ করে ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে।

এদের কর্মকান্ডে অতিষ্ঠ হলেও পেয়ারা চাষীদের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষাসহ পর্যটকদের ভ্রমণের আনন্দ দিতে স্থানীয় কিছু শিক্ষিত বেকার যুবকের উদ্যোগে একাধিক পার্ক গড়ে উঠেছে বলে সরেজমিন পরিদর্শন ও স্থানীয়দের সাথে আলাপ করে জানাগেছে।

এরকমই একজন উদ্দ্যোক্তা ও স্থানীয় শিক্ষিত বেকার যুবক অনুপ হালদার (২৫) জানায়, তিনি পৈত্রিক ৩ বিঘা সম্পত্তির নিয়ে লেকভিউ ইকোপার্ক কার্যক্রম শুরু করেন। তার এ লেকভিউ ইকোপার্র্ক ভীমরুলী জলে ভাসমান পেয়ারা হাটের মাত্র ৫০গজ পূর্বে ৩বিঘা জমির উপর তৈরী করা পুরোটাতে পেয়ারা বাগান থাকায় এখানে ৬০/৭০জন মানুষ নির্বিঘে ঘুরে ভ্রমণ আনন্দ নিতে পারবে। দেশীয় খাবারের জন্য হোটেলের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ফাস্টফুড, কোল্ট ড্রিংকসসহ পর্যটকদের চাহিদা পুরণের সব ব্যবস্থাই রয়েছে। স্বরুপকাঠির ইন্দিরহাট থেকে গোলপাতা এনে ৪টি কটেজ তৈরী করা হয়েছে। এছাড়াও সারি সারি বেঞ্চ ও টেবিল দেয়া থাকবে।

ব্যক্তিগত কথা জানতে চাইলে অনুপ হালদার বলেন, আহসান উল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞানে ২০১৭ সালে উত্তীর্ণ হয়েছেন। ওই বছরের ১ মার্চ অনুপের জার্মানে যাবার কথা থাকলেও ১ জানুয়ারী তার পিতা গৌরাঙ্গ হালদার মারা যাওয়ায় তিনি আর দেশ ত্যাগ করেননি। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, বাবা-মা’র একমাত্র সন্তান হিসেবে বাবা মারা যাবার পর থেকেই মায়ের কাছে থাকার ইচ্ছা। ঢাকায় চাকুরী হলেও মায়ের কাছ থেকে দূরে যাননি তিনি। এরপর এলাকায় থেকেই কিছু একটা করার চিন্তা তার মাথায় ঘুরপাক করতে থাকে। ভ্রমণ, রেস্টেুরেন্টে খাওয়া, আড্ডা দেয়ার প্রতি ছোটবেলা থেকেই তার আগ্রহ বেশি। একারণে ভীমরুলী ভাসমান পেয়ারা হাটের মাত্র ৫০গজ দূরত্বে তিনি লেকভিউ ইকোরিসোর্ট তৈরী করার উদ্যোগ নেন। এটি নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। পর্যটন কেন্দ্রের পূর্ণ রূপ দিতে আরো কয়েকদিন সময় লাগবে বলে জানান কম্পিউটার বিজ্ঞানে উত্তীর্ণ অনুপ হালদার।

স্থানীয় কয়েকজন জনপ্রতিনিধি ও গন্যমান্য ব্যক্তি জানায়, দক্ষিণাঞ্চলের পেয়ারাবাগান ও ভাসমান পেয়ারাহাট হিসেবে ভীমরুলী বিখ্যাত। এখানে স্থানীয় কয়েকজন বেকার ও শিক্ষিত যুবকদের উদ্যোগে কয়েকটি পার্ক গড়ে উঠেছে। যা বিনোদন প্রেমিদের জন্য নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। ভীমরুলীতে ভাসমান এ পেয়ারা হাট পরিদর্শন করেন ২০১৮ সালে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত হর্ষবর্ধন শ্রীংলা। গত ১১ জুলাই (বৃহস্পতিবার) পরিদর্শন করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার ও তার সঙ্গে সফর সঙ্গিরা সবাই মিলে ঘুরে ঘুরে দেখলেন পুরো ভাসমান বাজার।এসময় ঝালকাঠি জেলাপ্রশাসক মোঃ জোহর আলী , পুলিশ সুপার ফাতিহা ইয়াসমিন উপস্থিত ছিলেন।

পরিদর্শনকালে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাস্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার মন্তব্য করেন, থাইল্যান্ড-ভিয়েতনামের বিভিন্ন বড় বড় শহরে এমন জলেভাসা বাজারের দেখা মেলে। কিন্তু বাংলাদেশের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে জলেভাসা বাজার-হাট গড়ে ওঠা সত্যিই অবাক করার মতো। তাও আবার জমজমাট হাট। আদো বাংলায় তিনি বলেন, ‘এটি দেখতে সত্যিই চমৎকার!’ অদ্ভুত সুন্দর এই ভাসমান হাটটি। তার আশপাশের প্রকৃতি ও পরিবেশ যে কতটা নজরকাড়া হতে পারে, এটি এখানে না এলে বোঝার উপায় নেই।

জানাগেছে, বাংলার আপেল খ্যাত দেশী পেয়ারা উৎপাদনে পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি, বরিশালের বানারীপাড়া এবং ঝালকাঠি সদর উপজেলার সীমান্তে ৫৫ গ্রাম জুড়ে বিস্তৃত বাগানে প্রতি বছরই কোটি কোটি টাকার পেয়ারা উৎপাদিত হয়। আষাঢ়, শ্রাবণ ও ভাদ্র এ তিন মাস পেয়ারার ভরা মৌসুমে জমে উঠেছে ভীমরুলী খালে ভাসমান পেয়ারার হাট। এসময় পাকা পেয়ারার মৌ মৌ গন্ধ নিতে এবং সবুজের সমারোহ দেখতে আসে দেশ ও বিদেশের অনেক মানুষ। ঝালকাঠি জেলাধীন সদর উপজেলার কির্ত্তিপাশা ইউনিয়নের উত্তরদিকে এ ভীমরুলী গ্রাম অবস্থিত।

প্রথমবারের মতো কেউ সরেজমিনে গিয়ে মনে হতে করতে পারে,এটা স্থানীয় আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার অংশ গ্রহনে কোন বাইচ, কিন্তু কিন্তু কিছু সময়ের মধ্যেই বোঝা যাবে যে না এটি কোনো প্রতিযোগিতা নয়। বরং হাটের সময় ধরতে হবে তাই শত শত ডিংগি নৌকা চারদিক থেকে জলেভাসা পেয়ারার বাজার দিকে ছুটে আসছে। ছোট ছোট ডিঙি নৌকায় পণ্য নিয়ে শুরু হয় বিকিনিনি। ঝালকাঠি সদর উপজেলার অন্তর্ভুক্ত এ জলবাজারে প্রধান পণ্য পেয়ারা। সারি সারি নৌকার ওপর সবুজ-হলুদ পেয়ারা। এর ভারেই নৌকাও ডুবে রয়েছে অর্ধেক খানিক। হাটুরেদের হাঁকডাকে গম গম করে পুরো এলাকা। এক কথায় খালের ওপর এ এক আজব-অবাক করা বাজার।

স্থানীয়দের কাছে জানা গেল, এ অঞ্চলের ‘সবচেয়ে বড়’ ভাসমান হাট এটি, যা পুরো বাংলাদেশেই অনন্য। এছাড়াও পাশের পিরোজপুরের স্বরূপকাঠির (নেছারাবাদ) কুড়িয়ানা, আটঘর, আতা, ঝালকাঠির মাদ্রা। এসবই পিরোজপুর সন্ধ্যা নদী থেকে বয়ে আসা একই খালভীমরুলী জলে ভাসা হাটে পেয়ারা বোঝাই ডিঙি নৌকাগুলো একবার এপাশ, একবার ওপাশ, চাষিদের ভালো দামের আশায় এমন নড়চড়। খালের দু’পাশে ব্যবসায়ীদের আড়ৎ। তারাই কিনবেন।

বাংলাদেশের সিংহভাগ পেয়ারা উৎপাদনকারী অঞ্চলের চাষিরা ডিঙিতে বসে বিকিকিনিতে মগ্ন। প্রতিবছর শত বিদেশি পর্যটক এ স্থানে ভিড় জমান পুরো পেয়ারা মৌসুম জুড়েই। বাংলাদেশিদের জন্যও যা হতে পারে অপূর্ব ভ্রমণকেন্দ্র।