বিশেষ প্রতিবেদক ।। উপজেলার চরকাউয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা, আর্থিক জবাবদিহিতা, ধর্মীয় শিক্ষা ও সামাজিক ভূমিকা নিয়ে নানা অব্যবস্থাপনার অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোথাও কমিটির দ্বন্দ্ব ও হিসাব নিয়ে প্রশ্ন, কোথাও কার্যকর পরিচালনা কমিটি ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমের অভাব। আবার কিছু প্রতিষ্ঠানে স্বেচ্ছাচারিতা ও দলীয় করণে দৈন্যদশা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইউনিয়নের ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কয়েকটি জামে মসজিদ এবং শ্রীশ্রী সর্বজনীন কালীমাতা মন্দিরের কার্যক্রম পর্যালোচনায় এসব বিষয় সামনে এসেছে।
নয়ানী চৌমুখী জামে মসজিদ:
————-
১ নম্বর ওয়ার্ডের প্রায় ৪০ বছরের পুরোনো নয়ানী চৌমুখী জামে মসজিদে প্রতি শুক্রবার ২০০ থেকে ২৫০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করেন। চারটি পরিবার মসজিদ ও মাদ্রাসার জন্য ওয়াক্ফকৃত জমি দিয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানান।
মসজিদ পরিচালনা কমিটি থাকলেও এর কোন কোন প্রভাবশালী সদস্যের ভুমিকার কারনে কমিটির দায়ীত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বত’মান ইমাম প্রায় ১৩ বছর যাবৎ আছেন। তিনি নানা ঘটনায় বিতকি’ত হয়েও বিগত ও বত’মান কমিটির প্রধান ব্যাক্তিদের কৌশলে সন্তুষ্ট করে দাপটের সাথে বহাল থাকছেন বলে স্হানীদের ভাষ্য। তিনি একজন প্রশ্নবিদ্ধ ইমাম বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। তার বিরুদ্ধে অশ্লীল ভাষা ব্যবহার, মারামারিতে জড়ানো, প্রভাব বিস্তার এবং তদবিরের নামে অর্থ নেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় মুয়াজ্জিনকে লাঞ্ছিত করা এবং কোরআন তিলাওয়াতের শুদ্ধতা নিয়েও আপত্তি তুলেছেন কয়েকজন মুসল্লি। এ ছাড়া মসজিদ কমপ্লেক্সের ইসলামী কিন্ডারগার্টেন ও সাইনবোর্ডে উল্লেখিত মাদ্রাসার পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কমিটির প্রভাবশালী সদস্যদের কারণে অভিযোগের কার্যকর সমাধান হচ্ছে না বলেও দাবি স্থানীয়দের।
তাছারা তিনি সরকার পরিবত’নের আগে ক্ষমতাশীন দলের ওলামা লীগের সক্রিয় কমী’ ছিলেন এবং এখন বিএনপির ওলামা দলের সাথে যুক্ত বলে ঘোষনা করে তার বিতকি’ত ঘটনার সমালোচকদের উদ্দ্যেশ্যে প্রকাশ্যে দাপট দেখিয়ে মন্তব্য করার স্বাক্ষ্য প্রমান আছে বলে স্হানীয় একাধীক সূত্রের দাবী।
হাজী করিমউদ্দীন দপ্তরী বাড়ি জামে মসজিদ:
—————–
১ নম্বর ওয়ার্ডের প্রায় ৮০ বছরের পুরোনো হাজী করিমউদ্দীন দপ্তরী বাড়ি জামে মসজিদে প্রতি শুক্রবার প্রায় ১৫০ জন মুসল্লি উপস্থিত হন। স্থানীয়দের দাবি, পরিচালনা কমিটি দুই ভাগে বিভক্ত। বর্তমান সভাপতির বিরুদ্ধে পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকার হিসাব না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে মুসুল্লিদের মধ্যে বিরোধ ও প্রতিবাদকারীদের লাঞ্ছিত করার ঘটনাও ঘটেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তবে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় বছর ধরে দায়িত্ব পালন করা ইমামের বিষয়ে স্থানীয়দের মূল্যায়ন ইতিবাচক। তাঁদের মতে, স্বচ্ছ হিসাব ও সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে বিরোধ নিরসন সম্ভব।
বায়তুল ফালাহ জামে মসজিদ:
———-
৩ নম্বর ওয়ার্ডের পঞ্চায়েত বাড়ির বায়তুল ফালাহ জামে মসজিদটি প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো বলে স্থানীয়দের দাবি। একসময় এটি এলাকার একমাত্র জামে মসজিদ ছিল। মরহুম চেয়ারম্যান সেকান্দার আলী মিয়া মসজিদের জন্য জমি ওয়াক্ফ করেন এবং মসজিদের উন্নয়ন ও সাবিক ব্যাবস্হাপনার জন্য কমিটি কায’কর ছিল।
পরবর্তী সময়ে সেকান্দার আলী মিয়ার পুত্রদের মাধ্যমে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয় বলে স্থানীয়রা জানান।তবে কমিটি ব্যাবস্হা ক্রমশঃবিলুপ্ত হয়ে যায়।
প্রায় ২০ বছর আগে সেকান্দার আলী মিয়ার স্ত্রী মরহুমা হামিদা বেগমের উদ্যোগে চালু হওয়া মক্তবটিও পরে বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে কোন পরিচালনা কমিটি নেই।
বত’মান ইমাম প্রায় ১২ বছর যাবৎ আছেন।তিনি এখানে থেকে শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করে পরবতি’তে চাকরী ও ব্যাবসায় যুক্ত হয়েছেন।সেই সাথে তিনি একটি রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সদস্য। ইমামের বহুমুখী ব্যাস্ততা ও কমিটি ব্যবস্হা না থাকায় নিয়মিত জুম্মা নামাজের কার্যক্রম চললেও
ধর্মীয় শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতামূলক কোন উদ্যোগ নেই। মসজিদটির ঐতিহ্য ধরে রাখতে কার্যকর কমিটি গঠন, মক্তব পুনরায় চালু ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তুলাতলা জামে মসজিদ:
———
৩ নম্বর ওয়ার্ডের তুলাতলা জামে মসজিদটি প্রায় ৪০ বছর আগে মরহুম আলী আকব্বর হাওলাদার প্রতিষ্ঠা করেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। ওয়াক্ফকৃত জমিতে প্রতিষ্ঠিত মসজিদটিতে প্রতি শুক্রবার প্রায় ১৫০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করেন। কমিটি থাকলেও সব সদস্য সক্রিয় নন এবং অতীতের কমিটির কারো কারো বিরুদ্ধে আর্থিক হিসাব সঠিক ভাবে না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তবে বর্তমান ইমাম দায়িত্বশীল এবং তিনি পূন’কালীন দায়িত্ব পালন করেন বলে স্হানীয়রা জানান। স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সক্রিয় কমিটি নিশ্চিত করা গেলে মসজিদটি ধর্মীয় শিক্ষা ও সামাজিক কল্যাণে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
বায়তুল আমান জামে মসজিদ:
————
৩ নম্বর ওয়ার্ডের সিকদার বাড়িতে অবস্হিত প্রায় ১০০ বছরের পুরোনো বায়তুল আমান জামে মসজিদে প্রতি শুক্রবার আনুমানিক ১৫০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করেন। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, মসজিদটির জমি ওয়াক্ফকৃত, পরিচালনা কমিটি মোটামুটি সক্রিয় এবং ইমামকে নিয়ে উল্লেখযোগ্য অসন্তোষ নেই। এ ধরনের স্থিতিশীল ব্যবস্থাপনা বজায় রেখে ধর্মীয় শিক্ষা ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করা সম্ভব।
সর্বজনীন কালীমাতা মন্দির:
————-
চরকাউয়া ইউনিয়নের ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের একমাত্র সর্বজনীন মন্দির হিসেবে পরিচিত শ্রীশ্রী সর্বজনীন কালীমাতা মন্দিরটি দেবোত্তর সম্পত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এখানে প্রধান কালীপুজা ও শীতলা পূজার পাশাপাশি নিত্যপূজা অনুষ্ঠিত হয়। সরকারি অনুদান, স্থানীয়দের চাঁদা ও ভক্তদের অনুদানে মন্দিরের অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ এবং পুরোহিতদের সম্মানী দেওয়া হয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। মন্দিরটি এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা রাখছে।
সুপারিশঃ
————–
উপাসনালয়ে ভাতা প্রদান কর্মসূচি কার্যকর, স্বচ্ছ ও জনকল্যাণমুখী করতে রাষ্ট্রীয় নীতি, সরকারের সামাজিক উন্নয়ন কৌশল ও সমাজের বাস্তব পরিস্হিতির আলোকে নাগরিকদের প্রত্যাশার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিবেচনার জন্য আমরা একটি সুপারিশমালা সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের বিবেচনার জন্য প্রনয়ন করেছি। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. কর্মসূচির উদ্দেশ্য ও নীতিমালা নির্ধারণঃ
উপাসনালয়ে ভাতা প্রদান কর্মসূচির উদ্দেশ্য, নীতিমালা ও প্রত্যাশিত ফলাফল আগেই নির্ধারণ করতে হবে। রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ঘোষণা, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের আলোকে বাস্তবায়ন উপযোগী করে এ কর্মসূচি প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
২. ধর্মীয় উগ্রবাদ ও বিদ্বেষ প্রতিরোধ:
ধর্ম প্রচারের নামে যাতে ধর্মীয় উগ্রবাদ, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ কিংবা বিভাজন সৃষ্টির পরিবেশ তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
৩. সমাজভিত্তিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ:
উপাসনালয়গুলোর পরিচালনায় সমাজভিত্তিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি নিশ্চিত করতে হবে। এ লক্ষ্যে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও নির্দেশিকা জারি করা প্রয়োজন।
৪. স্বতন্ত্র নিরীক্ষা ও রেকর্ড মূল্যায়ন:
ভাতা প্রদানের আগে সংশ্লিষ্ট ধমী’য় প্রতিষ্ঠান গুলোর বিগত ১০ বছরের রেকর্ড এবং ইমামদের কর্মকালীন ও ব্যক্তিগত রেকর্ড মূল্যায়নের জন্য একটি স্বতন্ত্র নিরীক্ষা ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।
৫. যোগ্যতা ও পরিসর অনুযায়ী ভাতা নির্ধারণ:
মসজিদের আকার, মুসল্লির সংখ্যা, ইমামদের যোগ্যতা, দায়িত্ব ও কর্মপরিধি বিবেচনায় নিয়ে ভাতার পরিমাণে যৌক্তিক পার্থক্য রাখা প্রয়োজন।
৬. নিষ্ক্রিয় ও দ্বন্দ্বপূর্ণ কমিটি পুনর্গঠন:
কোনো মসজিদে মুসল্লির উপস্থিতি ও ইমামের দায়িত্ব পালন সন্তোষজনক হলে, পরিচালনা কমিটি নিষ্ক্রিয় বা দ্বন্দ্বপ্রবণ হলেও যথাযথ যাচাই ও স্থানীয় জনগণের মতামতের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে কার্যকর কমিটি গঠনের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।
৭. দলীয় কর্মসূচির পরিবর্তে সামাজিক উন্নয়ন:
সর্বোপরি, ভাতা প্রদান কর্মসূচিকে দলীয় কর্মসূচি হিসেবে বাস্তবায়ন না করে সরকারের একটি নিরপেক্ষ সামাজিক উন্নয়ন কর্মসূচি হিসেবে সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে। যাতে করে এর মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা, চাঁদাবাজি, মাদকাসক্তি, নারী ও শিশু নির্যাতনসহ বিভিন্ন সামাজিক অনাচার প্রতিরোধ এবং স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ নিষ্পত্তিতে উপাসনালয়গুলোকে ইতিবাচক ভূমিকা পালনের উপযোগী করে গড়ে তোলা সম্ভব হয়।
এসব সুপারিশ বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পিত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলকভাবে ভাতা প্রদান কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা গেলে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সামাজিক ভূমিকা আরও কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে ধর্মীয় সম্প্রীতি, সামাজিক শৃঙ্খলা ও জনকল্যাণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও কর্মসূচিটি ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে।