বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে জ্ঞানের চর্চা হবে এবং নতুন জ্ঞানের সৃষ্টি হবে।মেধা,চিন্তাশক্তি প্রতিভা বিকাশিত হবে।কিন্তু আমরা কি করছি?
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি একটা সার্টিফিকেট তো পাবোই। পাশ করে বের হতে পারলেই তো কিছু একটা করতেই পারবো।
এখন তো ক্রাস খাওয়ার সময়, ওয়েস্ট্রান কালচারের ড্রেস পরার সময়, প্রেম করার সময়, ফেইজবুকে ভাইরাল হওয়ার সময়, ভিডিও গেইম খেলার সময় এসেছে।এত দিন তো অনেক পড়াশুনা করেছি।এখন আমাদের ছেলিব্রেটি হতে হবে প্রতিদিন ঘুরতে গিয়ে ফেইসবুকে স্টোরি দিতে হবে।যারা কখনো সিগারেট খায় নাই তারাও এখন ওভার স্মার্ট হওয়ার জন্য সিগারেট খাওয়া শিখছি।
ভার্সিটিতে এসে প্রেম করতে না পারাটা তো লজ্জার ব্যপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।এখন ভার্সিটির লাইব্রেরী পড়াশুনার চেয়ে প্রেম করার জন্য উপযোগী জায়গা।
আবার কখনো কখনো এসব লাইব্রেরীর কক্ষে ছেলে মেয়েদের একসাথে তালাবদ্ধ অবস্তায় পাওয়া যায়! যাক এসব কথা পড়ে বলি।
জ্ঞান চর্চা আর গবেষণায় তো অনেক দূরের কথা। পরিক্ষার সময়ও দুইরাত টেবিলের কাছে বসতে চাই না।আর বলি এসব তো অন নাইট ফাইটের ব্যপার!পরিক্ষার সময় কোর্সের নাম জিজ্ঞাসা করে পরিক্ষা দেওয়াটা গর্ভ মনে করি।
ভার্সিটিতে আসছি এখন যদি রাজনীতি না করি তাহলে তো ব্যাকাপ দেওয়ার কেউ থাকবে না।বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখন ঘৃণ্য রাজনৈতিক চক্রের ও অন্যান্য কুচক্রী মহলের ক্রীড়ানক হয়ে কাজ করছে।র্যাগিং,সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি,বাস ভাংচুরের সংস্কৃতিতে নেমেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞান উৎপাদন,বিতরনের সংস্কৃতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।আর এ সবকিছুই যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পড়াশুনার অংশ হয়ে দাড়িয়েছে।ভার্সিটিতে এসে তো আমরা উচ্চ শিক্ষা অর্জন করছি তাই রাতে ঘুমাই না।১৩-১৪ ঘন্টা ফেইজবুকে না থাকলে কি আর চলে।ভাত না খেয়ে থাকা যায় কিন্তু ওয়াইফাই ছাড়া কি আর থাকা যায়।
এখন আমাদের ভার্সিটিতে কত কনসার্ট… এল.আর.বি, জেমস, শিরোনামহীন, অ্যাশেজ, তাহসান, ওয়ারফেজ.-একটার পর একটা এগুলাতে অংশগ্রহণ না করলে ভাবি ভার্সিটিতে পড়ি সেটাই মনে হবে না।
এখন আমরা নাচ, গান, হলি উৎসবও করি।ক্রাশ খাইছি, মাস্তি, বিয়ার, এই শব্দগুলো তো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কালচার হয়ে দাড়িয়েছে।
আর এছাড়া যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ভাল ছাত্র হিসেবে দাবি করছি তারা শিক্ষকদের কাজ থেকে নোট/স্লাইড পাওয়ার আশা করে বসে থাকি।আর এর বাইরে শুধু চোখ রাখে চাকরির বইতে।জ্ঞান চর্চা করে কি হবে!
অন্য দেশের শিক্ষার্থীরা যখন নতুন মৌল আবিষ্কার করে,গুগলে কাজ করে,নতুন ফাইটার জেটের নকশা করে,খনিজ সম্পদ আহরনের জন্য যন্ত্র আবিষ্কার করে তখন আমরা কিভাবে বেস্ট ফ্রেন্ড কে প্রপোজ করতে হয়।গার্লফ্রেন্ড এর সাথে কিভাবে ফ্লাট করা যায় সেগুলা নিয়ে ভাবি।
ভার্সিটির শিক্ষার্থীরা এখন আর প্র্যাক্টিকাল,লজিক্যাল, টেকনিক্যাল ও সাইন্টিফিক বিকাশ নিয়ে ভাবে না।জ্ঞান চর্চা আর মেধা বিকাশের জন্য একটা পরিকল্পিত ভাবনার দরকার।মেধার বিকাশ ঘটে বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে।
এখন আমরা মেধার বিকাশ ঘটাই ফেইজবুকে ফানি ভিডিও শেয়ার দিয়ে।বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে সার্টিফিকেটাই একমাত্র অর্জন হিসাবে বিবেচনা করি।
এখন হয়ত অনেকেই বলবে বিশ্ববিদ্যালয়ে সবাই তো আর জিনিয়াস হবে না।সবাই হওয়ার জন্য চেষ্টাও করবে না।
হুম, অবশ্যই ভার্সিটি মানেই মুক্তবুদ্ধি চর্চার জায়গা,এখানে ভাল খারাপ সব ধরনের ছাত্রই থাকবে।আর এটা মিলিটারি ক্যাম্পও না যেখানে সবাই এক ধরনের চিন্তা করবে।
হ্যা,অবশ্যই কিন্তু কতজন শিক্ষার্থী গবেষনা, নতুন জ্ঞানের আবিষ্কার নিয়ে ভাবেন? সে শিক্ষার্থীর সংখ্যা এত কম যে নেই বললেই চলে।
আবার অনেকেই বলবে শিক্ষকদের ঘৃণ্য রাজনীতি, সরকার কর্তৃক গবেষনার কাজে অবহেলা,সরকার কর্তৃক দেয়া বরাদ্দ সঠিক ভাবে কাজে না লাগানো এসব কারনে মৌলিক গবেষনার সংষ্কৃতি ধংস হচ্ছে।তবে এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভূমিকাও কম নয়।
আজকে তো আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে কতদাবী দাওয়া নিয়ে আন্দোলন করি।কই একবারও তো শোনা যায় নাই কর্তৃপক্ষের অবহেলায় গবেষণার জন্য বরাদ্দ না দেওয়া,ল্যাবরেটরি না থাকা, লাইব্রেরীতে পর্যাপ্ত বই না থাকার জন্য কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আন্দোলন করছে?
যে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটি এমন শিক্ষার্থীতে ভরে উঠতে পারে সে দেশ তলানিতে যাওয়াই যেন নিয়তি।হয়ত কোন এক সময় এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হবে এক একটি গবেষণা কেন্দ্র।যেখানে সব শিক্ষার্থীরা জ্ঞানের রাজ্যে বিচরণ করে জ্ঞান সৃষ্টিতে ব্যস্ত থাকবে।জানি এ আশা সুদূর পরাহত তবুও ভাল কিছু আশা করতে দোষ কি?
লেখক:মো.তরিকুল ইসলাম,গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।