আজমীর হোসেন তালুকদার, ঝালকাঠি: ঝালকাঠিতে এবার এক পুলিশ কর্মকর্তার মানবিক সহায়তায় দূরারোগ্য ও ব্যায়বহুল চিকিৎসা করাতে পেরে নতুন জীবন পেলো দরিদ্র পরিবারের দেড় বছর বয়সী শিশু সন্তান তামিমা আক্তার।
শহরের কাঠপট্টি পুরাতন কলাবাগান এলাকায় বসবাসরত দরিদ্র ড্রেজার শ্রমিক তাবির জোমাদ্দার ও তার স্ত্রী শাহনাজ আক্তারের মধ্যে স্বর্গিয় হাসি। আর তাদের জন্য মানবতার দূতের ন্যায় ভূমিকা রাখা সেই পুলিশ কর্মকর্তার প্রতি প্রকাশ করছে চীরকৃতজ্ঞতা।
জন্ম থেকেই দেড় বছর বয়স পর্যন্ত শিশুটির বয়ে বেড়ানো জটিল ‘মেনিংগোসেল’ রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ায় আনন্দে উৎফুল্লু পরিবারের সাথে আলাপ কালে এই বিষয় জানাগেছে।
শিশুটির মা শাহনাজ আক্তার সাংবাদিকদের জানায়, ২০১৫ সালে পুরাতন কলাবাগান এলাকার দরিদ্র ড্রেজার শ্রমিক তাবির জোমাদ্দার বিয়ে করেন তাকে। অভাব-অনটনের সংসার হলেও তারই মধ্যে ২০১৭ সালের ৪ আগস্ট তাদের কোলজুড়ে একটি কন্যা সন্তান জন্ম নিলে তার নাম রাখেন তামিমা আক্তার। কিন্তু একমাসের মধ্যেই সে ও তার স্বজনরা লক্ষ করে শিশুটির পিঠে গোলাকৃতির একটি টিউমারের মতো দেখা যায় এবং বয়স বা মাস বাড়ার সাথে সাথে গোলাকৃতির টিউমারটিও বড় হতে থাকে।
এ পর্যায়ে চিকিৎকরা একে ‘মেনিংগোসেল’ রোগ বলে জানিয়ে শিশুটিকে এ দূরারোগ্য-জটিল রোগে আক্রান্ত ও এ রোগে শিশুটির মৃত্যু ঝুঁকি রয়েছে বলে তারা জানায়।
শাহনাজ আক্তার আরো জানায়, একমাত্র সন্তানকে প্রানে বাচাতে সে শিশুটির পিতার সাথে আনেক কান্নাকাটি ও অনুরোধ করলেও তার দিনমজুর স্বামাীর পক্ষে সন্তানের চিকিৎসা ব্যয় বহন করা সম্ভব হচ্ছিল না বলে পরিবারের সম্মুখে অমানিষার অন্ধকার নেমে আসে। নিজেদের জমানো সামান্য যে টাকা পয়সা ছিল তা চিকিৎসায় শুরুর প্রথম পর্যায়েই শেষ হয়ে যাওয়ায় চিকিৎসা ব্যয়ের ক্ষেত্রে শুরু হয় অর্থ সংকট। কোথাও কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে এক পর্যায়ে দিকভ্রান্ত হয়ে সহযোগিতার আশায় ছুটে আসে ঝালকাঠির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) এম এম মাহমুদ হাসানের কাছে।
এ বিষয়ে ড্রেজার শ্রমিক তাবির হোসেন জোমাদ্দার জানায়, শহরের অনেক লোকের মুখেই তার মানবিক গুনাবলি কথা শুনে আমাদের শিশুকন্যার চিকিৎসার বিষয়টি জানাতে ও তার পিঠের গালাকৃতির টিউমারের মতো দেখাই তিনি সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার আগারগাঁও শিশু হাসপাতালে কর্মরত তার বন্ধু ডা. দেলোয়ার হোসেন ও ডা. সঞ্চিতার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী শিশু তামিমা ও তার পরিবারকে নিজের খরচে ঢাকায় পাঠান মাহমুদ হাসান এবং চিকিৎসকরা শুরু করেন শিশুটির চিকিৎসা। চিকিৎসার পুরো দায়িত্বে নেয়া পুলিশ কর্মকর্তা এম এম মাহমুদ হাসানের সহায়তায় দীর্ঘদিন চিকিৎসা শেষে শিশুটির দেড় বছর বয়সে ১৪ ডিসেম্বর আগারগাঁও শিশু হাসপাতালে অপারেশন করা হয় তামিমার। ‘মেনিংগোসেল’ রোগ থেকে মুক্তি পায় শিশুটি।
এ ব্যাপারে শিশুটির মা শাহনাজ আক্তার ও বাবা তাবির হোসেন তাদের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আমার মেয়ের সুচিকিৎসা যখন অনিশ্চিত, তখন মাহমুদ স্যার আমাদের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি আমার মেয়ের চিকিৎসার ব্যবস্থাসহ সমস্ত ব্যয় বহন করে পরম মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন। আমরা সব সময় তার জন্য দোয়া করি। এমন মানবিক পুলিশ কর্মকর্তা প্রতি জেলায় থাকলে আজ পুলিশের ভাবমূর্তী সারাদেশের মানুষের মনে শ্রদ্ধার স্থান করে নিত।
আর এ ঘটনার নেপথ্য মানবিক সাহায্যকারী ছিলেন ঝালকাঠির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) এম এম মাহমুদ হাসান বলেন, ‘মেনিংগোসেল’ রোগটি প্রথমে আমরা বুঝতে পারিনি। আমার ঢাকায় দুই বন্ধু চিকিৎসকের কাছে পাঠানোর পরে তারা রোগটি ধরতে পারেন। শিশুটির চিকিৎসার সব ব্যবস্থা করে দিতে পেরে আমিও আনন্দিত। আমারও সন্তান রয়েছে, নিজের সন্তানের মতোই যত্ন নিয়ে তার চিকিৎসার করেছি। পরিবারটির অসহায়ত্বের কথা শুনে নিজেও কষ্ট পেয়েছি। তাই একজন মানুষ হিসাবে এগিয়ে এসেছি। কোন প্রসংশা বা ধন্যবাদ পাওয়ার উদ্দেশ্যে নয়।