রবিবার, ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং, রাত ২:৫৬

বরিশালের চণ্ডাল নিরক্ষর রিকশাচালক, সব ছাপিয়ে কলকাতার জনপ্রিয় লেখক

প্রিন্স তালুকদার  কবি নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন, ` ও কে ? চন্ডাল ? চমকাও কেন ? নহে ও ঘৃণ্য জীব ! ওই হতে পারে হরিশচন্দ্র, ওই শ্মশানের শিব। আজ চন্ডাল, কাল হতে পারে মহাযোগী-সম্রাট, তুমি কাল তারে অর্ঘ্য দানিবে, করিবে নান্দী পাঠ ।’

ঠিক নজরুলের কবিতার মতই গল্পটি বরিশালের এক চন্ডাল পুত্রের। বরিশালের দ্লিত পরিবার জন্ম হলেও ৪৭’র দেশভাগ পাল্টে দিল পরিচয়। সালটা ১৯৫৩। দেশভাগের পাঁচ-ছ’ বছর পেরুলেও কি হবে? হাজারে হাজার শরণার্থী তখনও ছুটছে ওপার বাংলায়। বছর তিনেকের সেই চন্ডাল পুত্র তখনো তার নাম-ধাম কিংবা দেশ বোঝার বয়স হয়নি। সবে হাঁটতে শিখেছেন।

বুঝুক আর না বুঝুক ততক্ষণে পালটে গেছে অনেক কিছুই। বাবা, মা আর ভাইবোনদের হাত ধরে পাড়ি দিলেন অনিশ্চয়তার পথ। কাঁটাতারের সীমানা ডিঙানোর সাথে সাথে বদলে গেলে দেশ পরিচয়। উদ্বাস্তু হিসেবে ঠাঁই হলো বাঁকুড়ার শিরোমনিপুর রিফিউজি ক্যাম্পে। অকস্মাৎ ভারত সরকার থেকে আদেশ এলো এই ক্যাম্প ছেড়ে দণ্ডকারণ্যে যাওয়ার। দণ্ডকারণ্য হচ্ছে মধ্যপ্রদেশ, উড়িষ্যা, অন্ধ্রপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্র এই চারটি রাজ্য নিয়ে বিশাল এক অরণ্যময় অঞ্চল। ভিন্ন রাজ্য হওয়ায় ভাষার বৈচিত্রতা এবং দণ্ডকারণ্যের ঘন জঙ্গল, খাবার পানির অপ্রতুলতা ও ম্যালেরিয়া ডায়রিয়াসহ অন্যান্য প্রতিকূল পরিস্থিতি আর রামায়ণোল্লিখিত ভীতিকর পরিবেশ সম্পর্কে আগ থেকেই ওয়াকিবহাল থাকায় সরকারি আদেশ মানতে শিশুটির বাবা রাজি হয়নি।

শাস্তি হিসেবে তাদের নাম কাটা গেল ক্যাম্পের খাতা থেকে। বন্ধ হয়ে গেল সরকারি সহায়তা। সংসারে নেমে এল অভাব-অনটন। শুরু হল বালকের এক কঠিন লড়াই। জীবন টেকানোর লড়াই, মাথা গোঁজার ঠাঁই খোঁজার লড়াই, পেটের ভাত জোগাড়ের লড়াই। যে বয়সে স্কুলের ব্যাগ কাঁধে ওঠে, মন পড়ে থাকে পাড়ার খেলার মাঠে, সেই বয়সে ছাগল চড়ানো, চায়ের দোকানে খেটে দুটো পয়সা কামানোর চেষ্টা শুরু। ঘরে মায়ের পড়নে কাপড় নেই, মশারির টুকরো জড়িয়ে অন্ধকারে বসে থাকেন। অসুস্থ্য বাবা খিদের জ্বালায় গলাকাটা ছাগলের মত চিৎকার করেন। চোখের সামনে ছোট দিদিকে খিদেতে শুকিয়ে মরতে দেখেছেন। পরিবারের এই অভাব দেখে বালকটি দিলেন পলায়ন। জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, গুয়াহাটি, লখনৌ, বেনারসে হন্যে হয়ে ঘুরেছেন, বেগার খেটেছেন। দোকানের পাউরুটি চুরি করে পালানো, কুকুরের মুখ থেকে খাবার ছিনিয়ে নিয়ে নিজের মুখে নিয়েছেন শুধু বেঁচে থাকার তাগিদে।

তারপর ১৯৬৯ সালের দিকে আবার কলকাতায় ফিরে যাদবপুর স্টেশন চত্বরে রিক্সা চালানো শুরু। চাকু-বোমা ধরায় হাতেখড়ি, শেষে নকশাল আন্দোলনে অনুপ্রাণিত হয়ে যোগদান- রোজ রোজ জীবনের গতিপথ বদলেছে বহতা নদীর মত। যার বাঁকে বাঁকে রয়েছে হরেক কিসিমের গল্প।প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না হলেও প্রতিটি দিন যেন বইয়ের এক একটি নতুন পাতা, নয়া ছবক। সামনে তখন দুটো পথ, হয় লাশকাটা টেবিল নয়তো জেলখানার অন্ধকার কুঠুরি। ছোটখাট অন্যায় অপরাধ আর দিবারাত্রি মদে বুঁদ হয়ে থাকার পরে একসময় অপরাধী হিসেবে মেলে চৌদ্দ শিকের কারাগারে৷ তবুও ভাল দুবেলা দুমুঠো খাবার নিয়েতো নিশ্চিন্ত। এই জেলেই অন্তরীন থাকা অবস্থায় এক কয়েদির সংস্পর্শ তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেখানেই প্রথম অক্ষরপরিচয়৷ বৃদ্ধ কয়েদি নিজে অবতীর্ণ হলেন শিক্ষক ও বই রূপে। তাকে দেখালেন আলোর পথ, দিলেন রসের সন্ধান। বইয়ের জগতে ডুব দিলেন নিজেকে খুঁজতে। জেলে বসে তিনি দুটো বই পড়তে পেরেছিলেন। প্রথম পড়েছিলেন মনোজ বসুর নিশিকুটুম্ব, মহাশ্বেতা দেবীর অরণ্যের অধিকার। এর পর পড়তে লাগলেন হাজার চুরাশির মা, চাণক্য সেনের পিতা-পুত্র।

একসময়ে বেরোলেন জেল থেকে। রিক্সা চালানোর পাশাপাশি মারামারি, মদে বুঁদ হয়ে থাকা সবকিছু চললেও একটা নেশা তাঁকে ছাড়ে নি। বইয়ের নেশা। এই ভংয়কর নেশা তাঁকে জাপটে ধরল। জেল থেকে বেরিয়ে কারাগার বিষয়ক যত বই পড়া শুরু করলেন। বই পড়ার সময় একটি শব্দ পেলেন যার অর্থ তিনি জানতেন না। একদিন তাঁর রিক্সায় এক নারী সাওয়ার হলেন, দেখে শুনে শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত বলেই মনে হল। সাহস করে সেই নারীর কাছে জানতে চাইলেন ‘জিজীবিষা’ শব্দের মানে কি? একজন রিক্সাচালকের এমন প্রশ্নে কৌতূহল জাগলো সেই নারীর। তিনি শুধু শব্দটির অর্থ বলেই থামলেন না, চললো আরও কথোপকথন।

জানতে চাইলেন রিক্সাচালক কিভাবে বই পড়া শুরু করলেন, কতগুলো ও কি কি বই পরেছেন। সব কিছু শুনে তিনি নিজের ম্যাগাজিন আলোকবর্তিকায় ওই রিক্সাচালককে নিজের গল্প লিখতে বললেন। ভদ্রমহিলা রিক্সাচালককে নিজের বাড়ির ঠিকানা দিলেন। রিক্সাচালক হাতে নিয়ে দেখলেন ওই ভদ্রমহিলা আর কেউ নন। স্বনামধন্য লেখিকা মহাশ্বেতা দেবী। রিক্সাচালকের কথায়, মহাশ্বেতা দেবীর সঙ্গে দেখা না হলে হয়তো তিনি শিক্ষিত এক রিক্সাচালকই রয়ে যেতেন। আজ তিনি দলিত সম্প্রদায়ের অন্যতম কণ্ঠস্বর, তাঁর লেখার মাধ্যমে৷ দলিত জীবনের অন্যতম ধারাভাষ্যকার তিনি। কিন্তু তাদের ওই সাক্ষাৎ সবকিছু বদলে দিল, নানা পত্র-পত্রিকায় তাঁর লেখা বেরতে থাকলো। আলোকবর্তিকা ম্যাগাজিনে লেখা ছাপা হওয়ার পর লেখার রিভিউ বেরোলো যুগান্তরে। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকল তার গুণগ্রাহীর সংখ্যা।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক থেকে শুরু করে অনেক উচ্চ পর্যায়ের লোক তাঁকে খুঁজে পরিচিত হতে লাগলেন। বাবু সমাজের লোকদের তিনি বলেছেন তারা তাদের চোখে আমাদের নিচেরতলার মানুষের যেভাবে দেখছে তা অনেক ক্ষেত্রে ঠিক নয়। আমরা আমাদের কথা লিখব। নিচের তলা থেকে বাবুদের জীবন দেখব, লিখব। খিদের বিরুদ্ধে লড়াই তার অন্তর্নিহিত শক্তি। তিনি লেখেন ভেতরের কষ্টের কথা বলতে, জাতপাতের বেড়াজাল ছিন্ন করতে। তিনি নিজেকে খেলোয়াড় বলেন। তিনি এসেছেন পিছিয়ে পড়া দলিত শ্রেণীর মানুষকে লড়াইয়ের বার্তা দিতে, তাদের অধিকারের কথা বলতে। বিমানেই চড়ুন আর ট্রেনেই চড়ুন, তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গীগামছা। তাঁর কথায় তিনি সঙ্গে গামছা রাখেন, তাঁর শিকড়কে মনে রাখার জন্য। এই ভদ্দরলোক বাবুদের মাঝে নিজের লড়াইয়ের কথা যাতে ভুলে না যান। গামছা ঘাম-রক্ত মোছে, গামছা অনেকের বিছানা, অনেকের শীতবস্ত্র, গামছা অনেকের কাছে ছাতা, গামছা সব লড়াইয়ের সাক্ষী।

তিনি আর কেউ নন, ভারতের জনপ্রিয় লেখক মনোরঞ্জন ব্যাপারি! তাঁর আত্মজীবনী ‘ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবন’ ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়েছে, ‘Interrogating My Chandal Life: An Autobiography of a Dalit’, অনুবাদক শিপ্রা মুখার্জী। বইটির জন্যে তিনি পেয়েছেন ‘বাংলা একাডেমী পুরস্কার’ এবং জাতীয় স্তরের বিভিন্ন পুরস্কার । ২০১৮এর জানুয়ারি মাসে ‘দ্য হিন্দু’র সেরা লেখক বলে বিবেচিত হয় তাঁর নাম। সত্তর ছুঁইছঁই মানুষটি কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। বলেছিলেন, “এই আনন্দ শুধু আমার নয়, যাদের বঞ্চিত করা হয় তাদের সকলেরই”। মনোরঞ্জন ব্যাপারীর ভাষায়, ‘আমি নিপীড়িত এই জীবন মেনে নিইনি।’ আরও বলেন, ‘সাহস করে এগোতে হয়।’ ক্রমাগত লিখছেন অস্পৃশ্যদের নিয়ে। লিখিয়ে হিসেবে তাঁর উত্থান নাটকীয়তায় ভরা। ক্রমে তা ভারতে বড় সংবাদ হয়ে উঠছে।

তাই বলে জীবন যুদ্ধ থামেনি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় উদ্বাস্তুদের ঢল নামে পশ্চিমবঙ্গে। তখন রাজনৈতিক অস্থিরতাও চরমে। উদ্বাস্তু কাকার ছেলের সাথে হঠাৎ পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে মধ্যপ্রদেশে চলে যাওয়া, গাছ কেটে বিক্রি করে উপার্জন শুরু।পরবর্তীতে মধ্যপ্রদেশের বিখ্যাত শ্রমিক নেতা ও তাত্ত্বিক শংকর গুহ নিয়োগীর সংস্পর্শে এসে শ্রমিক আন্দোলনে যুক্ত হন। বেশ কয়েকবছর পর আবার কলকাতায় ফেরা, আবার শুরু লেখালিখি। কলম হাতে আবার যুদ্ধ ঘোষণা। সে যুদ্ধ খিদের বিরুদ্ধে, সে যুদ্ধ জাতপাতের বিরুদ্ধে, সে যুদ্ধ কঠিন-কঠোর জীবনের বিরুদ্ধে। এবার তাঁর জেতার পালা। প্রতিদিনই প্রচুর খাটতে হয় ষাটোর্ধ ব্যাপারীকে। দক্ষিণ কলকাতার মুকুন্দপুরে হেলেন কেলার বধির স্কুলে প্রায় ১৫০ জনের রান্নার কাজ করেন। এই করতে করতে ১৫টা উপন্যাস এবং প্রায় দেড় শ গল্প লিখেছেন। একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন।

গত বছর জয়পুর সাহিত্য উৎসবে আমন্ত্রণ পেয়ে বাংলার এলিট সাহিত্যিকদের মনঃপীড়ার কারণ ঘটিয়েছেন। তাঁকে নিয়ে মুভি তৈরির কথা হচ্ছে। সর্বশেষ আমাজনের সাবসিডিয়ারি ‘ওয়েস্টল্যান্ড’ তাঁর বই অনুবাদ করে প্রকাশের স্বত্ব কিনে নিল। জাত পাতের বিরুদ্ধে বরিশালের চন্ডাল পুত্র মনোরঞ্জন ব্যাপারীর লড়াইয়ের সাথে লালন ফকিরের সুরে সুর মিলিয়ে বলা যেতে পারে, ব্রাক্ষন, চন্ডাল, চামার-মুচি, এক জলেই সব হয় গো শুচি, দেখে শুনে হয় না রুচি, যমে তো কাকেও ছাড়বে না।।