অনলাইন ডেস্ক আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কর ফাঁকি দিচ্ছেন স্বয়ং রাষ্ট্রপ্রধানরাই। ৩৫ জন সাবেক ও বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধান এই দোষে দোষী বলে দাবি করেছে ফাঁস হওয়া একটি রিপোর্ট। ‘প্যানডোরার নথিপত্র’ নামে ঐ রিপোর্টে বলা হয়েছে, কর ফাঁকি দিতে রাষ্ট্রপ্রধানরা বিদেশি অ্যাকাউন্টে ভিন্ন পথে অর্থ চালান করছেন।
একইভাবে বিদেশে বেনামে বহুমূল্যের বাড়ি এবং সম্পদও কিনেছেন। তালিকায় নাম আছে শচীন টেন্ডুলকারের মতো নামী ক্রিকেটারসহ ৩০০ ভারতীয়ের। আর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের ঘনিষ্ঠজনসহ ৭০০ পাকিস্তানির নাম তালিকায় উঠে এসেছে। আছেন পপতারকা শাকিরাও।
সামনে আরও অনেকের নাম প্রকাশ করা হবে বলে জানা গেছে। তবে রাশিয়া, ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের স্ত্রী, চেক রিপাবলিকের প্রধানমন্ত্রী, জর্ডানের বাদশাহসহ বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।
গোটা পৃথিবীর ১৩০ জন বিলিয়োনিয়ারের বিরুদ্ধে অভিযোগ সামনে এসেছে। গত কয়েক দশকে ‘প্যানডোরা পেপারস’ সবচেয়ে বড় আর্থিক দুর্নীতির স্টিং অপারেশন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই নথি ফাঁস বিশ্বের রাজনীতি ও কূটনীতিতে প্রভাব ফেলবে বলেও মনে করছেন অনেকে। ইনটারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট বা সংক্ষেপে আইসিইজে একটি মঞ্চ। বিশ্বের ১১৭টি দেশের ৬০০ জনের বেশি বিশিষ্ট সাংবাদিক এই মঞ্চের সঙ্গে যুক্ত। যুক্ত বিশ্বের ১৫০টি সংবাদ সংস্থাও।
বিশ্বের মোট ১৪টি আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার কাছ থেকে ১ কোটি ১৯ লাখ নথি প্রকাশ্যে এনেছেন সাংবাদিকেরা। তাদেরই উদ্যোগে বিশ্বের বৃহত্তম স্টিং অপারেশন বা অনুসন্ধানী অপারেশন সংঘটিত হয়েছে, যার নাম ‘প্যানডোরা পেপারস’। আর সেখানেই উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার থেকে জর্ডানের বাদশাহ, কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট এবং একাধিক তারকার আর্থিক দুর্নীতির রোমহর্ষক তথ্য ফাঁস হয়েছে।
তালিকায় রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধান
‘প্যানডোরার নথিপত্র’ দেখিয়েছে, কীভাবে কর ফাঁকি দিয়ে জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ বিদেশি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মালিবু, ক্যালিফোর্নিয়া, ওয়াশিংটন ও লন্ডনে ১০ কোটি ডলারের সম্পত্তি কিনেছেন। চেক প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেজ বাবিস, যিনি এই সপ্তাহেই ভোটে দাঁড়াতে চলেছেন, তিনি কেন তার বিপুল বিদেশি সম্পত্তির হিসাব দেখাতে পারেননি তা জানা গেছে। এছাড়া দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রনেতাদের তালিকায় রয়েছেন আজারবাইজান, কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট ও তাদের পরিবারের সদস্যরাও।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের ঘনিষ্ঠ মহলের বেশ কয়েক জন নেতা এমনকি কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও রয়েছেন প্যানডোরার তালিকায়। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নাম সরাসরি না এলেও মোনাকোর একটি সম্পত্তির সূত্রে তিনিও রয়েছেন প্যানডোরার দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রনেতাদের তালিকায়।
আইসিইজে জানিয়েছে, এই নথি হয়তো এই নেতাদের সরাসরি দোষী সাব্যস্ত করতে পারবে না। তবে এই প্রমাণ তাদের ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে লজ্জাজনক হতে পারে। কেন না, এসব রাষ্ট্রনেতা কোনো না কোনো সময়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। আর এখন তারা নিজেরাই দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন।
শচীনসহ ৩০০ ভারতীয়ের নাম তালিকায়
স্বচ্ছ ভাবমূর্তির জন্য ভারতে বিশেষ নাম আছে ক্রিকেটার শচীন টেন্ডুলকারের। তার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা বলেন, যুবসমাজের ক্ষতি হতে পারে এমন বিজ্ঞাপনও তিনি করতে রাজি হন না। ৯১টি দেশের বিভিন্ন রাষ্ট্রনেতার নামের সঙ্গে সেই শচীনের নাম উঠে এসেছে প্যানডোরা পেপারস দুর্নীতিতে। আইসিআইজে যে রিপোর্ট পেশ করেছে, তাতে ব্যবসায়ী অনিল আম্বানিসহ ৩০০ ভারতীয় এবং সংস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, শচীন যাদের মধ্যে এক জন। এছাড়া অন্তত ৬০ জন পরিচিত ব্যক্তির নাম আছে।
শচীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ব্রিটিশ ভার্জিনিয়া দ্বীপে তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন, যা আইন মোতাবেক বেআইনি। পানামা দুর্নীতির কাগজ বাইরে আসার পর শচীন সেই বিনিয়োগ লিকুইডেট (ভাঙিয়ে ফেলা) করেছিলেন বলে অভিযোগ। পুরো প্রক্রিয়াটিই অবৈধভাবে করা হয়েছিল। শচীনের আইনজীবী অবশ্য এ কথা অস্বীকার করেছেন।
সংবাদমাধ্যমকে তিনি জানিয়েছেন, শচীন বিদেশের মাটিতে যে বিনিয়োগ করেছিলেন, তা ভারতের কর কর্তৃপক্ষকে জানিয়েই করা হয়েছিল। বিনিয়োগ ভাঙানোর পরেও তার জন্য প্রয়োজনীয় ভারতীয় কর দেওয়া হয়েছিল। সমস্ত ফাইলই তৈরি আছে। যদিও প্যানডোরা পেপারসের সঙ্গে জড়িত সাংবাদিকদের বক্তব্য, শচীনের বিরুদ্ধে তাদের হাতেও তথ্যপ্রমাণ আছে।
পাকিস্তানের ৭০০ জনের নাম
প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের ঘনিষ্ঠজনসহ পাকিস্তানের ৭০০ জনের নাম তালিকায় উঠে এসেছে। এর মধ্যে অর্থমন্ত্রী শওকত তারিন ও সিনেটর ফয়সাল ভাওদা রয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন মিডিয়ার মালিক, ব্যবসায়ী, সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা কর ফাঁকি দিয়েছেন বলে নথিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। জং গ্রুপ এডিটর ইন চিফ মীর শাকিলুর রেহমান, ডনের প্রধান নির্বাহী হামিদ হারুন এবং এক্সপ্রেস মিডিয়া গ্রুপের প্রধান নির্বাহী সুলতান আলী লখনৌ রয়েছেন।