মোঃ মেহেরাব হোসেন রিফাত,বিএম কলেজ,বরিশাল ।। বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের কলেজ শাখার আয়োজনে ২০২৫-২৬ সেশনের নবীন শিক্ষার্থীদের বরণ করে নিতে নবীনবরণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) সকালে বিএম কলেজের বাস্কেটবল গ্রাউন্ডে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী ডাকসুর সাবেক ভিপি, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূর এমপি।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সরকারি ব্রজমোহন কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. শেখ মো. তাজুল ইসলাম। প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় সিনিয়র সহ-সভাপতি নেওয়াজ খান বাপ্পি।
এ ছাড়া আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ছাত্র অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল বিভাগ) রাশেদুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক মোহাম্মদ আলী তোহা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি এ.কে.এম. রাকিব। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ছাত্র অধিকার পরিষদ, বিএম কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক কে এম মাঈনুল হক।

প্রধান অতিথির বক্তব্য নূরুল হক নূর বলেন, শিক্ষার্থীদের একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের জন্য এখন থেকেই নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। যে পেশায় বা কর্মক্ষেত্রে যেতে চান, সে অনুযায়ী চার বছরের শিক্ষাজীবনেই প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে হবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এসব দেশে যেতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষা, ইংরেজি এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতা অর্জন করা জরুরি। বিদেশে শ্রমবাজারের পাশাপাশি প্রকৌশলী, চিকিৎসক, আইটি বিশেষজ্ঞ, ব্যাংকারসহ দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য ‘হোয়াইট কলার’ চাকরির সুযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের তাই নিজেদের দক্ষতা অনুযায়ী কোন দেশে কী ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে, তা জেনে প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিদেশে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশের চাহিদা যাচাই করে ডিমান্ড ম্যাপিং করা হয়েছে। ইতোমধ্যে এক কোটি প্লাস কর্মসংস্থানের চাহিদাপত্র পাওয়া গেছে। সেই চাহিদা অনুযায়ী দেশের কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণদের বিদেশের শ্রমবাজারের উপযোগী করে গড়ে তোলার কাজ চলছে।
বিএম কলেজের আবাসিক হলের জরাজীর্ণ অবস্থা নিয়ে নুরুল হক নূর বলেন, শিক্ষার্থীদের এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। হলগুলোর সংস্কার ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিষয়টি তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলে জানান। একই সঙ্গে কলেজের খেলার মাঠগুলো সংস্কার করে খেলাধুলার উপযোগী করার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
কলেজের পরিবহন সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিএম কলেজ নিজস্ব অর্থায়নে দুটি বাস কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলে এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সচিবের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি বরিশালের জাতীয় নেতৃবৃন্দ ও জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় শিক্ষার্থীদের পরিবহন, মাঠ সংস্কার ও বৃত্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
নিজের শিক্ষাজীবনের স্মৃতিচারণ করে প্রতিমন্ত্রী নূর বলেন, তিনি কৃষক ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। জীবনের শুরুতে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন থাকলেও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না হওয়ায় বিসিএসের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তার বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি নবীন শিক্ষার্থীদের বোঝাতে চান পারিবারিক বা আর্থিক সীমাবদ্ধতা সফলতার পথে স্থায়ী বাধা নয় ইচ্ছাশক্তি, পরিশ্রম ও লক্ষ্য ঠিক রেখে এগিয়ে গেলে কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভব।
তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, কেউ উদ্যোক্তা হতে চাইলে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে, কেউ সরকারি চাকরি বা ব্যাংকে যেতে চাইলে এখন থেকেই সেই পরীক্ষার ধরন সম্পর্কে ধারণা নিতে হবে। আর যারা বিদেশে ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষা ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে হবে। অনার্সের চার বছরকে তিনি নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে উল্লেখ করেন।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে নুরুল হক নূর বলেন, দেশের পরিবর্তনে শিক্ষার্থী ও তরুণদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন এবং আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী তরুণদের সুস্থতা কামনা করেন। জুলাই আন্দোলনে আহতদের তালিকায় যারা অন্তর্ভুক্ত হতে পারেননি, তাদের অন্তর্ভুক্তির সুযোগ এবং আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণদের সরকারি চাকরিতে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে সরকারের উদ্যোগের কথাও জানান তিনি।
সবশেষে তিনি শিক্ষার্থীদের হতাশ না হয়ে নিজেদের লক্ষ্য নির্ধারণ করে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, জীবনে নানা সমস্যা ও সংকট থাকবেই, তবে কোনো সমস্যাই স্থায়ী নয়। তাই সমস্যায় হতাশ না হয়ে তা সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. শেখ মোঃ তাজুল ইসলাম বলেন, তোমরা যারা নবীন শিক্ষার্থীরা রয়েছো তোমাদের ঐতিহ্যবাহী সরকারি ব্রজমোহন কলেজে আন্তরিকভাবে স্বাগত। তিনি বলেন, প্রধান অতিথি প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নূর ক্যাম্পাসে এসে শুধু আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেননি বরং দীর্ঘ সময় নিয়ে ক্যাম্পাস ও বিভিন্ন ছাত্রাবাস ঘুরে শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলো সরেজমিনে দেখেছেন এবং তা সমাধানে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে তাঁর ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন অধ্যক্ষ। একই সঙ্গে নবীন শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগী হয়ে নিজেদের যোগ্য ও দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলার, ভালো ফলাফল অর্জনের এবং নিজেদের স্বপ্ন পূরণের আহ্বান জানান তিনি। শিক্ষার্থীরা নিজেদের বাবা-মায়ের পাশাপাশি সরকারি ব্রজমোহন কলেজের সুনাম ও ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করবে এমন প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন অধ্যক্ষ।
নবীনবরণ অনুষ্ঠানে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের নবীন শিক্ষার্থীদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়। এ সময় অতিথিরা নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন এবং শিক্ষাজীবনে জ্ঞানার্জন, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।