মঙ্গলবার, ১১ই মে, ২০২১ ইং, সকাল ৮:০৯
শিরোনাম :
বরিশালে ভাড়া বাসায় বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্রীর মৃত্যু ঘিরে রহস্য ঘনীভূত বকশীগঞ্জে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত ৬৫০ পরিবারের মাঝে শাড়ি-লুঙ্গী বিতরণ পুকুর খননকালে উঠে এলো মানুষের কঙ্কাল! ফুলবাড়ীতে দরিদ্রদের মাঝে বন্ধুমহল সেচ্ছাসেবী সংগঠনের ঈদ উপহার বিতরণ গঙ্গায় ভেসে উঠছে শতাধিক মৃতদেহ, ভারতে নতুন আতঙ্ক দক্ষিণাঞ্চলের দেড় কোটি মানুষের ২৬ আইসিইউ বেড, ২ হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন! জেরুজালেমে রকেট হামলা আস্থা ভোটে হেরে ক্ষমতা হারালেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী দেবীদ্বারে বৃদ্ধ দম্পতিকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে যখম করল ভাতিজা পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর পক্ষে অসহায়,হতদরিদ্র ও কর্মহীন মানুষের মাঝে ইফতার সামগ্রী বিতরণ

তাজা মুখে বাসী ইলিশ

টরোন্টো (কানাডা) থেকে শওকত মিল্টন  ইলিশ নিয়ে আমার অনেক পাগলামো আছে। আর এর বেশীরভাগটাই আমি পেয়েছি ইলিশ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে।

ইলিশ, ইলিশ জেলে, মহাজন নিয়ে যতো কথা বলেছি, তার খুব কম অংশই বই পড়ে জেনেছি, সরাসরি মাঠ থেকেই আমার তথ্য পাওয়া। বহুবার ইলিশ জেলেদের সাথে থাকার, রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা আমার আছে। তাদের সাথে কাজ করতে গিয়ে এমনও হয়েছে, বৃষ্টিতে ভেজা কাপড় চোপর আবার শরীরের তাপেই শুকিয়েছে।

সেবার ইলিশ জেলেদের নিয়ে কাজ করতে মেঘনায় গিয়েছি। থাকা খাওয়া ঘুম জেলেদের নৌকা আর ডেরায়। কালো তেল চিটচিটে বালিশে মাথা দিয়েও শুতে সমস্যা হয় না। হোগলা পাতার পাটিতে বহু ব্যবহৃত যে কাঁথা আমাদের খাতির করে বিছিয়ে দিয়েছিল, তা থেকে অনেক পুরুষের ইলিশের বাসী গন্ধ মৌ মৌ করে। অথচ আমার গন্ধ উৎকট লাগেনি। দারুন ঘুম হয়েছে। এই বিছানা আর বালিশের আয়োজন জেলেদের সেই ভাসমান গ্রামে, রীতিমতো রাজকীয়। এমনই একটা সময়ে আমরা মানে আমি আর বিশ্বজিত, ঘুম থেকে উঠেছি।

সকাল সাতটা সাড়ে সাতটা বাজে তবে মেঘনায় এই সকালকেও দুপুর মনে হয়। কারন সেখানে সকালেরও আগে ভোরে দিন শুরু হয়। তো ঘুম থেকে ওঠার পরপরই আমাদেরকে এক টিনের সোর নৌকার মাঝি বললো, নেবাই মুখ ধুইয়েন না, আগে খাইয়া যান। আমি বলি, মেবাই, মুখ না ধুইয়া খায় ক্যামনে। প্রতি উত্তর পাই, আগে এদিকে আহেন। দেখি সুপারী গাছের পাটাতনে রক্তারক্তি। ইলিশ কাটা হচ্ছে বটিতে। তোলা উনুনে ইলিশ ভাজার আয়োজন চলছে।

জানলাম রাতের খেওতে ভাল মাছ ধরা পড়ছে। শুধু অল্প তেলে লবন দিয়ে ইলিশ ভাজা হলো, সাথে সামান্য একটু কাটা পেঁয়াজ আর কাচা মরিচ সাঁতলানো হলো। জানলাম ওই পেঁয়াজ আর মরিচটুকু অতিথির জন্য। হোগলা বনের পাশে ওই সুপারীর পাটাতনেই আমরা খেতে বসলাম এলুমিনিয়ামের থালায়। এক খাবলা মোটা চালের ভাত ভাজা ইলিশের টুকরা আর সেই সাঁতলানো পেঁয়াজ মরিচ। আমি মাঝির কথায় বাসী মুখে ভাজা ইলিশ আর ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতে মনোযোগী হই।

এরই মধ্যে আষাঢ়ের বর্ষন শুরু হয়। মেঘনা ঝাপসা হয়ে ওঠে। বৃষ্টির ছাঁট এসে আমাদের গায়ে লাগে। ইতস্তত না করে বাসী মুখে গরম ভাত আর ইলিশ পড়ে। তখনও আমার থালার সামনে তাজা ইলিশের রক্ত বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে যাচ্ছে। কয়েক প্রজন্মের ইলিশের গন্ধ লেগে থাকা সুপারীর পাটাতনে আসন গেড়ে আমরা খেতে থাকি।

আমার মুখের মধ্যে এক অমৃত স্বাদ অনূভব করি। খুব সামান্য ভাজা ইলিশের ভেতরটা আগুনে সেদ্ধ হওয়া। কোন মশলার কেরামতি নেই। শুধু সাঁতলানো পেঁয়াজের মিষ্টি ভাব। আমি সেই বৃষ্টিস্নাত মেঘনার সকালে জেলেদের মতো তিন টুকরো ইলিশ দিয়ে দুই থালা ভাত সাবার করেছি। তাজা ইলিশ, বাসী মুখে কেমন যেন একটা আলাদা মাত্রা এনে দেয়।

হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও সেই বাসী মুখের ভাজা ইলিশ খাওয়ার কথা মনে পড়ে। আমি কাঁসার থালায় ইরাবতি ইলিশে মেঘনার গন্ধ খুঁজতে খুঁজতে সুপারীর পাটাতনে বসে যাই। আমি তাজা, ব্রাশ করা মুখে বাসী ইলিশ খাই, কয়েক প্রজন্মের বাসী ইলিশ। আর দূরে বৃষ্টির মতো ঝাপসা হয়ে ওঠা এক অলৌকিক জলযান বরিশালের দিকে মিলিয়ে যায়।