শনিবার, ৩০শে জুলাই, ২০২১ ইং, রাত ১:০৩

হিরণ ছিলেন মুকুটহীন সম্রাট

শামীম আহমেদ  দক্ষিণাঞ্চলের রাজনৈতিক সচেতন বলেখ্যাত বরিশাল-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য, আধুনিক বরিশাল নগরী গড়ার একমাত্র রূপকার, সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র ও মহানগর আ’লীগের সভাপতি আলহাজ্ব শওকত হোসেন হিরণ। ২০১৪ সালের ৯ এপ্রিল সকালে মাত্র ৫৮ বছর বয়সে টানা ৩২ বছরের রাজনৈতিক জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে ১৯দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে সকল প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে তিনি (হিরণ) পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন। বরিশালের একমাত্র মুকুটহীন সম্রাট আলহাজ্ব শওকত হোসেন হিরণের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে এই লেখা।

নগরীর সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কাজল ঘোষ সহ বিভিন্ন রাজনৈতীক ব্যাক্তিদের দেয়া তথ্যে জানা গেছে, বরিশাল বিভাগের পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার কালীশুরি ইউনিয়নের আড়াইনাও গ্রামের বাসিন্দা ও পুলিশের সাব ইন্সপেক্টর আব্দুল হাসেম সরদার এবং গৃহিনী জয়নব বেগম দম্পত্তির ৪ পুত্র ও ৬ কন্যার মধ্যে শওকত হোসেন হিরণ ছিলেন তৃতীয়। বরিশাল শহরের আলেকান্দা এলাকার নানা বাড়িতে ১৯৫৬ সালের ১৫ অক্টোবর শওকত হোসেন হিরণ জন্মগ্রহণ করেন।

লেখাপড়ার সুবাধে ছোট বেলা থেকেই নানা বাড়ি বরিশাল শহরে তার বসবাস। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এরশাদের ১৮ দফা কর্মসূচীর দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বরিশালের রাজপথে নতুন ধারা ছাত্র সমাজের ব্যানারে নেতৃত্ব দেয়ার মাধ্যমেই তার (হিরণের) রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ। এরপর আর পিছু ফিরতে হয়নি তাকে। একে একে যুব সংহতি, ১৯৮৪ সালে ফ্রন্টেরও বরিশালের নেতৃত্বদানকারী নেতা ছিলেন তিনি। ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি গঠনের পর শওকত হোসেন হিরণ রাজনীতিতে আরো সক্রিয় হন। সে সময় তিনি (হিরণ) বরিশাল শহর জাতীয় পার্টির সাধারন সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৫ সালে বরিশাল সদর উপজেলা পরিষদের দ্বিতীয় নির্বাচনে মাত্র ২৯ বছর বয়সী শওকত হোসেন হিরণ বিপুল ভোটের ব্যবধানে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই থেকেই জনপ্রতিনিধি হিসেবে তার পথচলা। জনপ্রতিনিধি হিসেবে বেশ স্বল্পসময়েই হিরণ বরিশাল শহরবাসীর হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন।

১৯৯৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে অনুপ্রানিত হয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর মাধ্যমে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে ফুলের তোড়া দিয়ে শওকত হোসেন হিরণ আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ফলে সহজেই বরিশাল শহর আ’লীগের সাধারন সম্পাদকের দায়িত্ব পান। এরপর থেকেই পাল্টে যেতে শুরু করে বরিশাল মহানগরীর রাজনৈতিক দৃশ্যপট। প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে দলীয় নেতাকর্মীদের একত্রিত করার মাধ্যমে রাজপথে তার ছিলো বলিষ্ঠ ভূমিকা। তিনি ছিলেন আন্দোলন সংগ্রামের ১৪ দলের সমন্ময়ক। যে কারনে বিএনপি অধ্যুষিত বরিশাল নগরী থেকে ২০০৮ সালের ওয়ান ইলেভেন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে শওকত হোসেন হিরণ জনগনের বিপুল ভোটের মাধ্যমে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনিই প্রথম নগরীতে সকল দলের অংশগ্রহণে সহঅবস্থানের রাজনীতির ধারা চালু করেছেন। হিরণের নিরলস প্রচেষ্ঠার কারনেই বরিশাল নগরী সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও ছিনতাইকারী মুক্ত হয়েছিলো। অবশ্য এজন্য তাকে দলের কতিপয় নেতার চোখের শুলও হতে হয়েছিলো।

সূত্রে আরো জানা গেছে, ১৯৭৫ সালের পর থেকে বরিশাল নগরীছিলো সকল প্রকার উন্নয়ন বঞ্চিত। সিটি কর্পোরেশনে আ’লীগ সমর্থিত মেয়র হিসেবে হিরণ-ই একমাত্র মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর তার দুরদর্শীতার কারনেই রাতারাতি পাল্টে যেতে শুরু করে নগরবাসীর জীবনচিত্র। নগরীতে ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন হিরণ। বরিশালকে তিনি একটি শিশু বান্ধব নগরীতে পরিনত করেছেন। এছাড়া শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন, নগরবাসীর জন্য একাধিকস্থানে বিনোদন কেন্দ্র, যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতিকরনসহ ভ্রমন পিপাসুদের জন্য তিনি বরিশালকে একটি আদর্শ নগরীতে পরিনত করেছেন। ফলশ্রুতিতে দলমত নির্বিশেষে তিনি চলে গিয়েছিলেন সাধারন মানুষের হৃদয়ের মনিকোঠায়।

রাজনীতিতে তিনি (হিরণ) দীর্ঘদিন বরিশাল শহর আ’লীগের সাধারন সম্পাদক, মহানগর আ’লীগের আহবায়ক ও ২০১২ সালে কাউন্সিলের মাধ্যমে সভাপতি নির্বাচিত হয়ে দলের গুরু দায়িত্ব পালন করেছেন। সর্বশেষ গত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শওকত হোসেন হিরণ বরিশাল-৫ (সদর) আসন থেকে বিনাপ্রতিদ্বন্ধীতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন

শওকত হোসেন হিরন শুধু নামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরিশালের মানুষের কাছে আস্থার এবং নির্ভরতার প্রতীক হতে পেরেছিলেন। কথা এবং কাজের মেলবন্ধন তিনি তৈরি করে দেখিয়েছিলেন, মাত্র সাড়ে চার বছরে তিনি একটি মফস্বল শহর কে আমূল পরিবর্তন করে ছিলেন, যেটা নগরবাশীর কাছে ছিল বিস্ময় জাগানিয়া। সত্যিকার অর্থেই তিনি একটি তিলোত্তমা নগরী উপহার দিতে পেরেছিলেন।যদি আলোকসজ্জার কথা বলা হয়, মেয়র নাইট, কিংবা নৌকাবাইচ, দুই লেইনের রাস্তা, এমন অসংখ্য প্রথম এর সাথে নগরবাসীকে পরিচয় করে দিয়েছিলেন শওকত হোসেন হিরন। এমনকি সূর্যোদয়ের পূর্বে নগরের বর্জ্য পরিষ্কার করিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।

তিনি যেমন উন্নয়নের ধারা তৈরি করেছিলেন,ঠিক তেমনি তিনি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আমূল পরিবর্তন এনেছিলেন, রাজনীতির সহবস্থান নিশ্চিত করেছিলেন। যা বরিশালের রাজনীতিতে অপরিচিত ছিল। তিনি সবাইকে এক করতে পেরেছিলেন এবং অসম্ভব রকমের দৃঢ়চেতা ছিলেন, তিনি সব সময় মানুষের মাঝে থাকতেন, এমনকি তাকে ফোন করে কথা বলা যেত এবং নির্দিষ্ট সময়ে বাসায় তার সাথে সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ পাওয়া যেত, কোন ধরনের কাঠ খড় পোহানো ছাড়াই! এটিই ছিল তাঁর নেতৃত্বের অন্যতম গুণ, আর এ কারণেই তিনি জনগণের হিরন হতে পেরেছিলেন।

৩০ ওয়ার্ডের বাড়ি বাড়ি থেকে বাঁশি বাজিয়ে ময়লা অপসারণের উদ্যোগও তাঁর হাত ধরেই চালু হয়েছিল। নগরে বালুর গাড়ি চলাচলে নিষেধাজ্ঞা এবং রাত জেগে নিজেই বেশির ভাগ তদারক হিরন করতেন।

শওকত হোসেন হিরন দলমত-নির্বিশেষে কাজ করার পরিবেশ সৃষ্টিতে উদাহরণ সৃষ্টি করেছিলেন তিনি।২০১৩ সালে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি সম্মেলন উপলক্ষে নগরে বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনাসহ দলের নেতা-কর্মীদের বিলবোর্ডে ছেয়ে যায়। দুই দিন পর বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বরিশালে আসেন জনসভা করার জন্য। শওকত হোসেন হিরন ওই জনসভা সফল করার জন্য দলের সব বিলবোর্ড সরিয়ে ফেলেন। সেই সব স্থানে মুহূর্তের মধ্যে খালেদা জিয়াসহ দলের নেতাদের ছবি, বিলবোর্ড স্থান পায়।

এমনকি ওই জনসভা যাতে সফল হয়, সে জন্য আগের দিন বঙ্গবন্ধু উদ্যানে বিএনপির জনসভাস্থল নিজে মাঠ পরিদর্শন করেন। বরিশালের ইতিহাসে কোনো ধরনের হামলা ও সহিংসতা ছাড়া বিএনপির ওই জনসভা সফল হয়। যা আজও বিএনপির অনেক নেতা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন।১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বরিশালে ঘটে যাওয়া সন্ত্রাস, অন্য দলের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের সব ঘটনা বন্ধ হয়ে যায় হিরন মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর। পাশাপাশি অবস্থান করে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও অন্যান্য দল রাজনীতি করেছেন। হামলা-মামলার ঘটনা প্রায় শূন্যে দাঁড়িয়েছিল হিরনের কল্যাণে। যার ফলশ্রুতিতে বরিশাল নগর শান্তির নগর হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল ।

এরইমধ্যে ২০১৪ সালের ২২ মার্চ রাত ১০টার দিকে বরিশাল ক্লাবে দলীয় বৈঠক শেষে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে হিরণ ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মেঝেতে পরে গিয়ে তার মস্তিস্কে রক্তক্ষরন হয়। তাৎক্ষণিক তাকে শেবাচিম ও পরে ওইদিন রাতেই ঢাকার এ্যাপোলো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার মস্তিস্কে ‘ডিকমপ্রেসিভ ক্রানেকটমি’ নামে একটি অস্ত্রোপাচার করা হয়। পরে মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওই বছরের ২৪ মার্চ রাতে সাংসদ হিরণকে থাই এয়ার এ্যাম্বুলেন্সযোগে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। সেখানে ২৫মার্চ তার মাথায় আরো একটি অস্ত্রোপাচার করা হয়।

এরপর বিপদের শঙ্কা কিছুটা কেটে গেলে পরে তাকে মাউন্ট এলিজাবেথ থেকে গ্লেনঈগলস হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। দীর্ঘদিনেও হিরণের জ্ঞান ফিরে না আসায় চিকিৎসকেরা লাইফ সার্পোট খুলতে চাইলেও সাংসদ হিরণের একমাত্র কন্যা রোশনী হোসেন তৃষা লাইফ সাপোর্ট চালিয়ে নেয়ার পক্ষে ছিলেন। যে কারনে আমৃত্যু পর্যন্ত লাইফ সার্পোটে সজ্ঞাহীন অবস্থায় ছিলেন এমপি হিরণ। সিঙ্গাপুর থেকে ২০১৪ সালের ৩ এপ্রিল গভীররাতে হিরণকে (স্থায়ীভাবে বোধশক্তিহীন অবস্থায়) দেশে ফিরিয়ে এনে পুনরায় ঢাকার এ্যাপোলো হাসপাতালে লাইফ সার্পোট দিয়ে রাখা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯ এপ্রিল সকালে হিরণ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে হিরণ স্ত্রী, ১ পুত্র ও ১ কন্যাসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন রেখে গেছেন।

হিরণের মৃত্যুর পর বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছিলো। দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনতা গভীর শোকে বিমূর হয়ে পরেছিলেন। স্তব্ধ হয়ে পড়েছিলো গোটা নগরীর কর্মচাঞ্চল্য। ১১ এপ্রিল নগরীর বঙ্গবন্ধু উদ্যানে লাখো মানুষের অংশগ্রহণে মুকুটহীন এ সম্রাটের নামাজে জানাজা শেষে মুসলিম গোরস্তানে মায়ের কবরের পার্শ্বে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।

বরিশাল মহানগরের সাবেক সভাপতি, সাবেক মেয়র ও সাবেক সংসদ সদস্য শওকত হোসেন হিরনের সপ্তম মৃত্যু বার্ষিকী ম্লান হয়ে যাচ্ছে বর্তমান বৈশি^ক মাহামারী করোনার ছোবল বাধা হয়ে দঁড়িয়েছে।

যার কারনে এবার বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগ থেকে কোন কর্ম সূচি রাখা হয়নি বলে বিষয়টি নিশ্চিত করে মহানগর সভাপতি এ্যাড, একে এম জাহাঙ্গীর হেসাইন বলেন বর্তমান করোনা কালীন সময়ে একেইতো স্বাস্থবিধি চলার নির্দেশ থাকার কারনে লোক সমাগম করা যাবে না। সেকারনেই দলের পক্ষ থেকে এই মুহুর্তে কিছুই করা হবে না।